
১. রসূলুল্লাহ ﷺ কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন আরবদেশে যাদের ছিল অসাধারণ সম্মান, মর্যাদা এবং সততার খ্যাতি। বনু হাশিম ছিল কাবা ঘরের তত্ত্বাবধায়ক।
২. জন্মের পর তাঁর দাদা নাম রাখেন মুহাম্মদ।
‘মুহাম্মদ’ নামটির অর্থ- যিনি সর্বদা প্রশংসিত।
তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব নাম রাখেন মুহাম্মদ। তাঁর নাম শুনে মানুষ আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল, কারণ আরব সমাজে এই নামটি নতুন ছিল।
৩. শৈশবে তাঁকে হালিমা (রাঃ)-এর কাছে লালন-পালনের জন্য দেওয়া হয়।
আরবদের রীতি ছিল—সম্ভান্ত বংশের শিশুদের পাহাড়ী অঞ্চলে পাঠিয়ে বিশুদ্ধ ভাষা শেখানো এবং সুস্থভাবে বড় করা।
হালিমা (রা.) নবী ﷺ–কে গ্রহণের পর থেকেই তাঁর ঘরে বরকত নেমে আসে। হালিমা রা. তাঁকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করেন।
৪. হালিমা (রাঃ)-এর কাছে থাকা অবস্থায় বক্ষবিদারণের ঘটনা ঘটে।
শৈশবে দুইজন ফেরেশতা এসে নবী সাঃ এর বক্ষ বিদীর্ণ করে অন্তর পরিষ্কার করেন। এটি ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ নবুওতের প্রস্তুতি ও বিশুদ্ধতার প্রতীক।
এই ঘটনায় হালিমা রা. ভীত হয়ে তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেন।
৫. হালিমা রা. কাছ থেকে ফিরে আসার পর তাঁর মা আমিনার ইন্তিকাল।
মা আমিনা তাঁকে নিয়ে ইয়াসরিব বা মদিনা সফর করেন এবং ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ছয় বছর বয়সেই তিনি মাতৃহারা হয়ে পড়েন।
৬. মায়ের মৃত্যুর পর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর দেখাশোনা করেন।
দাদা আব্দুল মুত্তালিব নবী ﷺ কে অত্যন্ত স্নেহে লালন-পালন করেন এবং মসজিদুল হারামের প্রাঙ্গণে নিজের সম্মানিত আসনে বসতে দিতেন।
তিনি দাদার চোখের মনি ছিলেন।
তবে দুই বছর পরেই দাদার মৃত্যু তাঁকে আরেকবার অসহায় অবস্থায় ফেলে।
৭. দাদার মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হন।
তাঁর চাচা আবু তালিব দরিদ্র হলেও স্নেহ ও ভালোবাসায় তাঁকে আগলে রাখেন। বলা হয় নিজের সন্তানের চাইতেও তিনি নবীকে ﷺ বেশি ভালোবাসতেন। এই সম্পর্ক এমন শক্তিশালী ছিল যে, নবুওতের পরও আবু তালিব তাঁকে সবসময় বিপদ থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন।
৮. চাচার সাথে সিরিয়া গমন ও বুহাইরা নামক পাদ্রির সাথে সাক্ষাৎ।
এ সফরে খ্রিস্টান পাদ্রী বুহাইরা নবীর ﷺ মধ্যে ভবিষ্যৎ নবুওতের লক্ষণ দেখতে পান।
তিনি আবু তালিবকে সাবধান করে এবং তাঁকে মক্কায় ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন।
৯. কিশোর বয়সে ‘হিলফুল ফুযুল’ নামক ন্যায়-চুক্তিতে অংশগ্রহণ।
নবি সাঃ এই চুক্তিতে অংশ নেন। এ চুক্তির লক্ষ্য ছিল মক্কায় যাদের ওপর জুলুম করা হবে, তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। এ থেকে তাঁর ন্যায়পরায়ণতার পরিচয় ফুটে ওঠে।
১০. খাদিজা (রাঃ)-এর সঙ্গে বিবাহ।
যুবক বয়সে নবি সাঃ খাদিজা রাঃ ব্যবসা দেখাশোনার দায়িত্ব পান। এই দায়িত্ব তিনি সততার সাথে পালন করেন। এই সততা এবং নিষ্ঠা দেখে খাদিজা রা. তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। তাঁদের পরিবার ছিল সুখী, শান্তিপূর্ণ এবং বরকতময়।
খাদিজা (রা.) নবুওতের প্রথম মুহূর্ত থেকেই ইসলামের প্রকৃত সমর্থক ছিলেন।
১১. হিরা গুহায় ধ্যানমগ্নতা শুরু।
সমাজের মূর্তিপূজা, অবিচার ও নৈতিক পতনের কারণে নবি সাঃ এসব থেকে নির্জনে একাকি থাকার সিদ্ধান্ত নেন। সত্যের সন্ধানে তিনি এই গুহায় একান্তে অবস্থান করতেন। রাতের পর রাত তিনি আল্লাহর সৃষ্টির মহিমা নিয়ে ভাবতেন।
এই ধ্যানই ছিল ওহীর পূর্বপ্রস্তুতি।
১২. প্রথম ওহীর আগমন।
এক রমাদান মাসের লাইলাতুল কদরের রাতে ৪০ বছর বয়সে হিরা গুহায় প্রথম ওহী আসে—জীবরীল আ. এই ওহী নিয়ে আগমন করেন আল্লাহর আদেশে। জীবরীল আ. বলেন-
“পড়, তোমার প্রভুর নামে…” (সূরা আলাক ৯৬:১–৫)
এ ঘটনার পর তিনি ভীত হয়ে খাদিজা (রা.)–এর কাছে যান এবং খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহা তাঁকে সান্ত্বনা দেন। এভাবেই নবি সাঃ এর নবুওয়াতী জীবনের সূচনা ঘটে
১৩. গোপনে ইসলামের দাওয়াত শুরু।
প্রথম তিন বছর তিনি গোপনে নিকটজনদের মধ্যে ইসলামের সত্য প্রচার করেন।তাঁর কাছের মানুষদের অনেকেই ইসলাম গ্রহন করেন।
প্রথম মুসলিমদের মধ্যে ছিলেন খাদিজা (রা.), আলী (রা.), আবু বকর (রা.), জায়েদ (রা.) ।
এ সময় মুসলিমদের সংখ্যা ছিল অল্প কিন্তু ঈমান ছিল দৃঢ়।
১৪. প্রকাশ্যে দাওয়াত শুরু।
এরপর আল্লাহর আদেশে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত কাজ শুরু হয়। আল্লাহর আদেশে তিনি পাহাড়ে উঠে ঘোষণা করেন যে মানুষকে আল্লাহর পথে আসতে হবে। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে হবে। এরপর কুরাইশরা তাঁর বিরোধিতা শুরু করে।
তবুও তিনি ধৈর্যের সাথে ইসলামের দাওয়াত চালিয়ে যান।
১৫. কুরাইশদের বিরোধিতা ও নির্যাতন।
প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচারের পর থেকেই মুসলিমদের উপর নির্যাতন নেমে আসে। কুরাইশদের মাধ্যমে মুসলিমদের মারধর, বাঁধা, আগুনে পোড়ানো, দাসদের ওপর অত্যাচার, এসব চলতে থাকে।
মুসলিমদের ওপর কঠিন নির্যাতন করা হয়।
তবুও তাঁরা ঈমান ছাড়েননি।
১৬. মুসলিমদের সামাজিক বয়কট।
অনেক অত্যাচার এবং নির্যাতনের পরেও মুসলিমরা যখন ইসলাম থেকে একটুও সরল না, বরং তারা ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে লাগলো তখন মক্কার কুরাইশরা বনু হাশিম গোত্রকে তিন বছর বয়কট করে। তাদেরকে খাদ্য, বাণিজ্য, বিবাহ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক লেনদেনসহ সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়।
ক্ষুধায় তৃষ্ণায় অসুস্থতায় তিনটি বছর মুসলিমরা অনেক কষ্ট করে কাটায়। তাদের কাছে কেউ খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করত না তাই ক্ষুধার যন্ত্রণায় তারা গাছের পাতা পর্যন্ত চিবিয়ে খেয়েছিল। তাঁরা গাছের চামড়া খেতো বাঁচার জন্য।
শেষে কিছু ন্যায়পরায়ণ কুরাইশ সদস্য বয়কটের চুক্তিপত্র ছিঁড়ে বয়কট ভঙ্গ করে।
১৭. কিছু সাহাবীর আবিসিনিয়ায় হিজরত।
কুরাইশদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নবি সাঃ এর নির্দেশে কিছু সাহাবী আবিসিনিয়ায় হিজরত করে। ৮৩ জন সাহাবী সেখানে আশ্রয় পান। (মতভেদ আছে )
আবিসিনিয়ার রাজা নাজ্জাসি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এটি ছিল ইসলামের প্রথম হিজরত।
১৮. ‘আমুল হুজন’—দুঃখের বছর।
একই বছরে নবি সাঃ এর চাচা ও স্ত্রী মৃত্যুবরণ করলে তিনি প্রচন্ড দুঃখে এবং বেদনায় ভেঙে পড়েন। তিনি এতটাই কষ্ট এবং দুঃখ পেয়েছিলেন প্রিয় স্ত্রী এবং প্রিয় চাচার বিয়োগ ব্যথায় যে এই বছরটাকে ‘আমুল হুজন’—দুঃখের বছর বলা হয়।
১৯. তায়িফ সফর ও বঞ্চনা।
প্রিয়জনকে হারানোর দুঃখ ব্যথা ভুলতে এবং মক্কায় ইসলামের প্রসার কমে যাওয়ায় নবি সাঃ তায়িফ শহরে গিয়ে ইসলামের প্রচার করার কথা ভাবলেন এবং তিনি সেখানে গেলেন। সাথে ছিল প্রিয় সাহাবী জাহিদ ইবনে হারিসা । তায়িফবাসীরা ইসলাম তো কবুল করলোও না বরং তাঁকে পাথর ছুঁড়ে রক্তাক্ত করে।
২০. ইসরা ও মিরাজ।
তায়িফবাসীর নির্যাতন এবং তাঁর প্রিয় স্ত্রী খাদিজার মৃত্যু এবং প্রিয় চাচার ইন্তেকালের পর নবি সাঃ যে প্রচন্ড মানসিক কষ্টের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলেন তারই সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা তাকে নিজের কাছে ডেকে নেন। মাসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত যে সফর তাকে ইসরা এবং সেখান থেকে সাত আসমানে ভ্রমণকে মি‘রাজ বলা হয়।
এই সফরে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হয়।
এ ঘটনায় মুসলিমদের মনোবল শক্তিশালী হয়।
২১. সাহাবীদের মদিনায় হিজরত শুরু।
কুরাইশরা মুসলিমদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে সাহাবিরা মদিনায় হিজরতের যাত্রা শুভ করেন। মদিনাতে আনসাররা তাদেরকে সাদরে গ্রহন করেন। তারা মুসলিমদের জন্য নিজ ঘর, জমি, ব্যবসা পর্যন্ত ভাগ করে দেন।
ধীরে ধীরে মদিনাতে ইসলাম নতুন নিরাপদ ভিত্তি পেতে থাকে।
২২. নবি সাঃ কে হত্যার ষড়যন্ত্র।
কুরাইশরা সিদ্ধান্ত নেয় বহু গোত্রের তরুণরা একসাথে তাঁকে হত্যা করবে। আল্লাহ নবি সা. কে এ কুরাইশদের এই জঘন্য পরিকল্পনার সংবাদ দেন। এবং তাঁকে মদিনায় হিজরতের আদেশ দেন
২৩. নবি ﷺ মদিনায় হিজরত করেন।
একে একে সকল সাহাবীগন যখন মদিনায় হিজরত করেন তখন আল্লাহর আদেশে নবি সাঃ মদিনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। কুরাইশরা তাঁকে হত্যার জন্য তার বাড়ি ঘেরাও করে। নবি সাঃ আলি (রা.)কে তাঁর বিছানায় শুইয়ে রেখে কাফিরদের চোখে ধুলা দিয়ে বেরিয়ে যান ঘর থেকে। নবি সাঃ এর হিজরতের সংগী ছিলেন আবু বকর (রা.)। তাঁরা দুজন অনেক কঠিন অবস্থা পার করে নিরাপদে মদিনায় পৌঁছান।
এ হিজরতের মাধ্যমে মদিনায় ইসলামের রাস্ট্রীয় অধ্যায়ের সূচনা।