
একটা সত্য গল্প শোনো-
একজন শাঈখের সাথে এক আঠার বছরের যুবকের পরিচয় হয় এক যাত্রাপথে, বাসের মধ্যে । শাঈখের সাথে গল্প করার মাঝে ছেলেটি বলছিল তার ছোটবেলার কথা । তাকে এডপ্ট করা হয়েছিল একদম ছোট্টবেলায় । তার পালক বাবামা তাকে খুবই আদর করতো। কোন কিছুরই কমতি ছিল না তার জীবনে । বুঝ হবার পর থেকেই সে জানত, যাদেরকে সে বাবা মা বলে জানত এতদিন, তারা তার পালক বাবা মা, আপন নয় । কিন্তু এই পরিবারে সে এতই আদর যত্ন ভালোবাসা পেয়ে বড় হয়েছে যে তার নিজ বাবামার কথা কখনোই মনে পড়েনি ! হেসে খেলে পার হয়ে গেছে তার জীবনের অনেকটা সময়।
কিন্তু আরো একটুবড় হবার পর নিজের বাবা- মায়ের কথা তার খুব মনে হতো। তার ইচ্ছা হতো তার জন্মদাতা পিতা মাতাকে দেখার। আনমনে ভাবত সে কি তার মায়ের মত দেখতে হয়েছে? তার চেহারা কার মত ! তার হাত, তার পা, তার চোখ এগুলোর কোন কিছু কি তার মায়ের সাথে মিল আছে নাকি বাবার সাথে ? তার কি আর কোনো ভাই বোন আছে ? তারা কার মত হয়েছে দেখতে ? নানারকম চিন্তা ভাবনা করতে সে। তার খুব ইচ্ছা হতো তার বাবা মায়ের পরিচয় জানার।
যে মায়ের পেটে সে দশ মাস দশ দিন ছিল সেই মাকে দেখার জন্য, পিতৃ পরিচয়ের জন্য তার মন আনচান করত সব সময়ই। কোথায় গেলে সে তার জন্মদাতা পিতামাতার পাবে ! এই বাসে করে সে তার পিতামাতার খোঁজেই বেরিয়েছে ।
জন্মদাতা পিতা মাতার পরিচয় জানার জন্য এই আঠার বছরের তরুনের নিখাঁদ আকুতি শাঈখের অন্তর ছুয়ে যায়। নিজ পিতামাতা পরিচয় সম্পর্কে জানার জন্য যুবকটির ছিল অদম্য আগ্রহ যা দেখে শাঈখের মনে হচ্ছিল এই ছেলে তো জন্মদাতা পিতা মাতাকে খোঁজার জন্য সারা বিশ্বের কোনা কান্চি কিছুই বাদ রাথবে না, যতক্ষন সে তাদের খুঁজে না পায় ! এবং এটাই তো একজন যুক্তিযুক্ত, বুদ্ধি জ্ঞান সম্পন্ন মানুষের জন্য সঠিক কাজ, তাই না ?
এই ঘটনাটা মুসলিম হিসাবে আমাদের সাথে অনেক বেশি সম্পর্কিত । সেটা হল আমরা কি আমাদের সৃষ্টিকর্তার পরিচয় জানি ? আমরা কি তাঁকে চিনি ? যিনি আমাদের সৃষ্টি করলেন তিনি কেমন ?
আমরা কে ? কেন দুনিয়াতে এসেছি ?
কে সৃষ্টি করেছেন আমাদের ? তিনি কেমন ?
তিনি কোথায় থাকেন ?
আমরা কিভাবে তাঁর সাক্ষাত পাব ?
মানুষ হিসেবে এই প্রশ্নগুলো আমাদের মনে সব সময়ই আসতে পারে। আসা উচিত। নিজ পরিচয়, নিজের সৃষ্টিকর্তা, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, এই দুনিয়া আখিরাত এসব নিয়ে যদি কোন প্রশ্ন আমাদের মনে না আসে, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের অন্তর তালাবদ্ধ ! বুঝতে হবে আমরা চিন্তা ভাবনা করতে ভুলে গেছি !
প্রতিটা মানুষের জন্য কে তাকে জন্ম দিল, সে কিভাবে দুনিয়াতে আসলো তারা কারা , তাদের পরিচয় জানাটা নিজের অস্তিত্বের জন্য খুবই জরুরী। সে যদি কোনদিন নিজের পিতামাতাকে না খোঁজে, যদি কোন কেয়ার না করে এভাবেই তার জীবন চালিয়ে যায়, তাহলে এটা হবে তার জীবনের জন্য একটা অপূর্ণনীয় ক্ষতি। বিরাট বড় লস! শিকড়হীন গাছের মতই মিনিংলেস তার জীবন! সেরকম আল্লাহ সুবহানাতায়ালা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা, তাকে জানা, চেনা , ভালোবাসা এটা মানুষ হিসেবে, আল্লাহর একজন দাস হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ ।
হয়তো ভাবছো “কেন? এত কিছু জানার কী দরকার? আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমরা দুনিয়ায় আছি, একদিন মারা গিয়ে তাঁর কাছেই ফিরে যাব এ পর্যন্ত জানা কি যথেষ্ট নয়? আর কিইবা জানার আছে? আমি তো তাঁর আদেশনিষেধ মেনে চলি, সালাত রোযা করি, দানসদকা করি… আর কী?”
কিন্তু ভেবে দেখতো….
সারা জীবন যাঁর ইবাদত করলাম, এত আমল করলাম, কিন্তু সত্যিকার অর্থে জানতেই পারলাম তিনি কে ? কে আমার রব!
কে আমাকে সৃষ্টি করেছেন?
তাঁর প্রকৃত পরিচয় কী?
কেন তিনি আমাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন?
তিনি আমার কাছ থেকে কী চান?
এগুলো না জেনে শুধু ইবাদত করে যাওয়া মানে হলো জীবনের পুরো পথ অতিক্রম করলাম, অথচ যার কাছে যাবার জন্য পুরোটা পথ চলেছি, তাঁকেই চিনতে পারলাম না- এরকম একটা ব্যাপার।