সালাম – একটি জান্নাতি সম্ভাষন
সালাম - একটি জান্নাতি সম্ভাষন

এই প্ল্যাটফর্মে ইসলাম শেখা হয় সবচেয়ে সহজ, পরিষ্কার ও হৃদয়ছোঁয়াভাবে।নামাজ, ওযু, আদব-কায়দা আর আল্লাহকে চেনার সুন্দরতম পথ।

two-purple-flowers-are-growing-out-of-the-ground-photo

‘আসসালামু আলাইকুম (আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)’!

একটু বড় করে বলি, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ (আপনার ওপর শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক)’! 

আরও বড় করে বলি, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু (আপনার উপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক)’! 

কি সুন্দর সালামের ভাষা এবং তার অর্থ তাইনা!

আজ আমরা জানবো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ কিন্তু একদম সহজ যা সঠিকভাবে করলে বিরাট পুরস্কার পাওয়া যায় আল্লাহর তরফ থেকে। সুবহানআল্লাহ। 

যখন দুই বা ততোধিক মুসলিমের সাথে সাক্ষাৎ হয় তখন তারা একে-অপরকে প্রথমেই সালাম দিয়ে শুভেচ্ছা বা অভিবাদন জানায়। সালামের মাধ্যমে একে অপরের কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে।

পরস্পর সালাম বিনিময় শুধু একটি অভিবাদন নয়; বরং সালামে দিয়ে ভালোবাসা, শান্তি, কল্যাণ ও নিরাপত্তা কামনা করা হয়। সালাম একটি সহজ ইবাদত এবং একটি পবিত্র আমলও বটে। সর্বোপরি সালাম একটি উত্তম দোয়া।

সামান্য ইচ্ছা থাকলেই আমরা এত সহজে এত বড় ইবাদত প্রতিদিন করতে পারি।

সহিহ হাদিসে রসুল সা বলেন-  “হে মানুষগণ! পরস্পর মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও(অর্থাৎ একে‑অপরকে ‘আস্‑সালামু আলাইকুম’ বলো), ক্ষুধার্তকে খাবার দাও।আত্মীয়‑সন্তানদের সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রেখো, আর যখন অন্যরা ঘুমাচ্ছে তখন (গভীর রাতে ) সালাত আদায় করো; তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে।

সুবহানআল্লাহ যে কাজগুলো করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে তারমধ্যে সালাম একটি কাজ। একদম সহজ একটি কাজ।

সালাম দিয়ে আল্লাহর কাছে প্রিয়  

তোমরা কি জানো,

যে আগে সালাম দেয়, সে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়। 

সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে – হজরত আবু উমামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:
“যারা প্রথমে সালাম জানাবে, তারাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে কাছের লোক।”


এই হাদিস রিয়াযুস সালিহীন (হাদিস নং ৮৫৮)‑এ রাখা আছে এবং এটি আবু দাউদ ও তিরমিজি‑তে এসেছে- যেখানে বলা হয়েছে যে প্রথমে সালাম জানানো ব্যক্তি আল্লাহর নিকটবর্তী।

একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম সাক্ষাতে সালাম দেয়, বিদায়েও সালাম দেয়; ঘরে সালাম দেয়, আবার বাইরেও সালাম দেয়। আমার জীবনে দেশেবিদেশে পড়াশোনা করা এক ডক্টরেট শিক্ষককে পেয়েছিলাম। তিনি যেমন জ্ঞানী,  তেমনই উদার। তিনি আমাদের সালামের অপেক্ষায় থাকতেন না। আমি কখনও তাঁকে আগে সালাম দিতে পারিনি, তিনি আগে দিতেন।

সালাম একটি দোয়া

ইসলামে কোন কিছুই এমনি এমনি করা হয় না। প্রতিটা কাজই ইবাদত হতে পারে যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়।

সাধারনত যেই সব অভিবাদন গুলা আমরা আশেপাশে  শুনি তার হল হাই, হ্যালো, গুড মর্নিং এগুলো তাইনা ? এগুলো সাধারন অভিবাদন কোন অন্তর্নিহিত অর্থ ছাড়া। অনেকটা সামাজিক প্রথা বা কালচার।

যেমন “Good Morning” বলতে শুধু “সুপ্রভাত” বোঝায় — এটা কোনও দোয়া বা ঈমানের অংশ নয়। আবার হাই হ্যালো র কোন মিনিং নাই আসলে। এগুলোর মধ্যে সাধারণত দোয়া, শান্তি বা আল্লাহর বরকত প্রার্থনা থাকে না।
যদিও এগুলো ভালো ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু ক্ষনস্হায়ী সম্ভাষনের মত।

কিন্তু ইসলামে সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে একে অন্যকে দোয়া করা হয়। কথা বলার শুরুতেই সালাম। পরস্পর দোয়ার মাধ্যমে আলাপচারিতা শুরু – কত সুন্দর বিধান তাইনা ?

আমার এক সহকর্মী  আফসোস করে বলেছিলো,   ‘চেনা-অচেনা, ছোট-বড়, উঁচু-নিচু  সবাইকে সালাম দিই; এটা বাসার কেউ কেউ পছন্দ করে না।’ এমনটি হওয়া মোটেও উচিত নয়। সালাম বিনিময় করা ‘গুড মর্নিং’, ‘হাই’, ‘হ্যালো’ বলার মত সাধারণ কোনো বিষয় নয়; এটা লোক দেখানোরও কিছু নয়। সালাম দিলে কেউ ছোট হয় না; বরং সালাম বিনিময়ে মনের অহংকার দূর হয়, মন উদার হয়, হৃদয়ে মানুষের জন্য ভালোবাসা জন্মায়। সালাম পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে শান্তিময়, সুন্দর ও নিরাপদ করে।

সঠিকভাবে সালাম দেয়ার গুরুত্ব

যেনতেনভাবে সালাম বিনিময় একদম  উচিত নয়। শুদ্ধ উচ্চারণে, স্পষ্ট  আওয়াজে সালাম বিনিময় করা জরুরি। নাহলে সালামকে মনে হতে পারে ননসেন্স রাইম। ননসেন্স রাইম হলো, ‘আগডুম বাগডুম’, ‘ইচিং বিচিং’ জাতীয়  কিছু; যার কোনো অর্থ নেই। যেমন: ‘সালা মালে কুম’, ‘স্লামালেকুম’, ‘সাআম কুম’ ইত্যাদি। 

সালামের সঠিক উচ্চারণ: 

ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ ٱللَّٰهِ وَبَرَكَاتُهُ
(Assalamualaikum Warahmatullahi Wabarakatuh)

বাংলা উচ্চারণআস্-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্

বাংলা অর্থ“আপনার উপর আল্লাহর শান্তি, আল্লাহর রহমত এবং আল্লাহর বরকত বর্ষিত হোক।

সালামের উত্তরে যা বলা হয় : 

وَعَلَيْكُمُ ٱلسَّلَامُ وَرَحْمَةُ ٱللَّٰهِ وَبَرَكَاتُهُ

(Walaikumussalam Warahmatullahi Wabarakatuh)

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্

বাংলা অর্থ“আপনার উপরেও শান্তি বর্ষিত হোক, আল্লাহর রহমত ও বরকতও আপনার ওপর থাকুক।”

সালামের মাধ্যমে ঈমানের পুর্নতা

সালাম বিনিময়ের অভ্যাস না থাকলে একজন মুসলিমের ঈমান পূর্ণতা পায় না। সালাম বিনিময়ে সহজেই পূণ্য লাভ করা যায়।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, সালাম বিনিময় করলে মনের অহংকার দূর হয়। ইসলামি স্কলারগণ বলে থাকেন, ‘আপনার মন যদি কারো সালাম পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে, তাহলে বুঝবেন, আপনি নিরহংকার হতে পারেননি। আর অহংকার করা কবিরা গুনাহ।’

মুসলিম সমাজে আজ ভ্রাতৃত্ব সংকটে খাবি খাচ্ছে- কেউ কাউকে চিনি না; কেউ কারো খবর রাখি না; কেউ কারো ভালো চাই না। এখন সবাই নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে থাকতে বেশি পছন্দ করি। বেশি বেশি  সালাম বিনিময়ে এ সংকট অনেকটাই কমে যেতে পারে।

জান্নাতের অভিবাদন সালাম 

আল্লাহ  হজরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করে আদেশ করলেন, ‘যাও ফেরেশতাদের সালাম দাও। তারা তোমার সালামের কী উত্তর দেয়, মন দিয়ে শোনো। এটিই হবে তোমার এবং তোমার সন্তানদের সালাম।’ সে অনুযায়ী হজরত আদম (আঃ) ও উপস্থিত  ফেরেশতাগণ সালাম বিনিময় করলেন।   

এতে স্পষ্ট যে, সালাম বিনিময় করা আদম (আঃ) এর একটি সুন্নত। 

আমাদের  অভিবাদনের ভাষা যেমন ‘সালাম’, ফেরেশতাদের অভিবাদনের ভাষাও তেমন ‘সালাম’। আবার দুনিয়ার অভিবাদনের ভাষা যেমন ‘সালাম’, জান্নাতের অভিবাদনের ভাষাও হবে ‘সালাম’। সুবহানআল্লাহ। জান্নাতের সালাম আমরা দুনিয়াতে প্রাকটিস করি। 

সালামের উত্তর না দিলে গুনাহগার 

সালামের উত্তর “ওয়ালাইকুম আসসালাম” (আপনার ওপরও শান্তি বর্ষিত হোক)” দেওয়া ওয়াজিব। তাই কেউ সালাম দিলে তুমি অবশ্যই উত্তর দিবে।

কুরআনে আল্লাহ বলেছেন,

“যখন আপনাদেরকে কোনো অভিবাদন জানানো হয়… (তাহলে) উত্তমভাবে কিংবা সমভাবে জবাব দাও।” 
এটি আমাদেরকে সালামের জবাব দেয়ার গুরুত্ব বুঝায়।

যদি সালামের জবাব শোনা না যায়, যেমন মনে মনে বললে বা কোনরূপ উত্তর না দেওয়া হয়, তাহলে তা ওয়াজিব (জরুরি কর্তব্য) পূরণ করা হয়নি এবং এতে করে গুনাহ  হতে পারে। 

সালাম দেয়ার নিয়ম 

পবিত্র কুরআনের সুরা নিসার ৮৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ” আর যখন তোমাদেরকে সালাম দেওয়া হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে, অথবা (অন্ততপক্ষে) ততটুকু।’

এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা সালাম ও তার জবাবের আদব বর্ণনা করেছেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) উত্তম অভিবাদন বা সালাম করার (উত্তর দেওয়ার) ব্যাখ্যা হাদীসে এসেছে যে,

 ‘আসসালামু আলাইকুম’এর উত্তরে ‘অরাহমাতুল্লাহ’ বৃদ্ধি করা

 এবং ‘আসসালামু আলাইকুম অরাহমাতুল্লাহ’র উত্তরে ‘অবারাকাতুহু’ বৃদ্ধি করা।

 তবে কেউ যদি ‘আসসালামু আলাইকুম অরাহমাতুল্লাহি অবারাকাতুহু’ পর্যন্ত বলে, তাহলে কোন কিছু বৃদ্ধি না করে অনুরূপই উত্তর দিয়ে দিবে। (ইবনে কাসীর)

অন্য আর একটি হাদীসে এসেছে যে, কেবল ‘আসসালামু আলাইকুম’ বললে দশটি নেকী হয়, ‘অরাহমাতুল্লাহ’ যোগ করলে বিশটি নেকী হয় এবং ‘অবারাকাতুহু’ পর্যন্ত বললে ত্রিশটি নেকী হয়। (মুসনাদ আহমাদ ৪/৪৩৯-৪৪০)

সালাম, সালাম , সালাম। কখনো মিস্ করবেনা সালাম দেয়ার এবং সালামের উত্তর দেবার কোন সুযোগ। আশা করি বুঝতে পেরেছো কিভাবে একটু বাড়তি সালাম বা তার প্রতিউত্তর দিতে হয়। 

আজ থেকেই এই প্রাকটিস করতে পারবেতো ?

টিপস্ : বাইরে থেকে এসে সালাম দিয়ে ঘরে প্রবেশ করবে যদিও বাসায় কেউ না থাকে। 

শেয়ার করুন

Related Topic

No data was found