
আমরা সকলেরই দ্বিধায় থাকি অনেক কিছু নিয়ে। কিন্তু ইসলাম এত ক্লিয়ার যে এতে কোন দ্বিধা বা কিন্তু নেই। এটা ঠিক তেমনই সত্যি, যেমন করে আমরা প্রতি মুহুর্তে শ্বাস-প্রশ্বাস নিই। অনেকেই ভাবেন, তারা ভুল ধর্মে থাকত, যদি তারা অন্য কোনো মানে অমুসলিম কোন পরিবারে জন্ম নিতো? তাহলে তারা কি অন্য ধর্মের হতো, অথবা যদি তারা অন্য কোনো অমুসলিম দেশে জন্ম নিতো, তাহলে কি তাদের ধর্ম ভিন্ন হতো?
সর্বপ্রথম আল্লাহ সুবহানাতায়ালার দরবারে অশেষ কৃতজ্ঞতা এবং শুকরিয়া জানাই- আলহামদুলিল্লাহ আমি মুসলিম, আমি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েছি। তবে ইসলাম উপরে বর্ণিত এই প্রশ্নগুলোকে অস্বীকার করে না; বরং কোন ধর্মীয় বিশ্বাসকে উপলব্ধি করার সময় অনুসন্ধান এবং যুক্তি ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। তাই প্রশ্ন করা কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। ইসলামে সকল প্রশ্নের উত্তর আছে। যত প্রশ্ন করবে ততই তোমার ইসলামের ভিত্তি মজবুত হবে ইনশাআল্লাহ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ আমাদেরকে বলেন:
“…নিশ্চয়ই, তার বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞান রাখে, তারাই আল্লাহকে ভয় করে।” (সূরা ফাতির ৩৫:২৮)
চল নিচের কয়েকটি পয়েন্ট মনোযোগ দিয়ে পড়ি। আজ তুমি অনেক কিছু নতুন শিখতে যাচ্ছ
১. সকল নবীর একই বার্তা
সেই যে প্রথম মানুষ ও নবী আদম (আঃ) থেকে শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত মানবজাতির প্রতি আল্লাহর পাঠানো বার্তা পরিবর্তিত হয়নি। বার্তটি হলো: একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর পাঠানো নবীদের অনুসরণ করা। প্রত্যেক নবী ও রসুল আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে এই একটি সরল বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন: আল্লাহ এক। তাঁর কোন শরীক নেই।
২. কুরআন একমাত্র অবিকৃত পবিত্র গ্রন্থ
পবিত্র কুরান নিজেই একটি মিরাকল। একটি জীবন্ত প্রমান। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ একত্রিত হয়েও এরকম একটি কিতাব বা একটি সুরা বা একটি আয়াতও বানাতে পারবেনা। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা এই চ্যালেঞ্জ কুরআনের ভিতর দিয়ে রেখেছেন। দেড় হাজার বছর ধরে আজ পর্যন্ত কেউ সেই চ্যালেঞ্জ নিতে পারেনি । কুরআনের ভাষাশৈলী ও লেখার স্টাইল এই দুনিয়ায় কারো পক্ষে কপি করা সম্ভব নয়।
কুরআন নবী মুহাম্মদ (সা.) এর জীবদ্দশায় লেখা হয়েছে। সেই সময় হতে এখন পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষ কুরআন মুখস্থ করেছে। যাদের আমরা হাফিজ বলি। কুরআনের সকল কপি নস্ট হয়ে গেলেও মুহুর্তের মধ্যেই সারা বিশ্বের হাফিজগন কুরআন একত্রিত করে ফেলতে পারবে। শুধু তাই নয়, কুরআনের প্রতিটি শব্দ, অক্ষর ও বিরতি একইরকমভাবে অক্ষুণ্ণ আছে, সাড়ে ১৪০০ বছর ধরে।
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা পবিত্র কুরআনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন:
“নিশ্চয়ই, আমরা কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমরা এটিকে রক্ষা করব।” (সূরা হিজর ১৫:৯)
ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত একটি প্রাচীন কুরআন মানুসস্ক্রিপ্ট রয়েছে, যার বয়স প্রায় সাড়ে ১৪০০ বছর। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে এই পাণ্ডুলিপির আয়াতসমূহ আজ আমাদের হাতে থাকা কুরআনের একদম হুবহু অনুরূপ। আলহামদুলিল্লাহ, এটি কুরআনের সংরক্ষণ সম্পর্কে আল্লাহর প্রতিশ্রুতির একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।
রেফারেন্স:
- বার্মিংহাম কুরআন পাণ্ডুলিপি (Birmingham Qur’an Manuscript)
- অবস্থান: University of Birmingham – Cadbury Research Library
- কার্বন ডেটিং অনুযায়ী বয়স: ৫৬৮–৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দ, অর্থাৎ প্রায় ১৩৭০–১৪৪০ বছর পুরোনো
- এই পাণ্ডুলিপির লেখা কুরআনের আয়াতগুলো আজকের কুরআনের সাথে হুবহু মিলে যায়, কোনো পরিবর্তন নেই।
৩. ইসলাম যুক্তি, বিবেচনা ও জ্ঞানের ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। কিভাবে ?
মানুষকে যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। যুক্তি ছাড়া ঈমান দুর্বল । আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাই তিনি জানেন মানুষের অন্তরের খবর। তিনি জানেন মানুষের গভীর ঈমানের জন্য প্রমাণ প্রয়োজন। ইব্রাহিম (আঃ) ও আল্লাহর কাছে তাঁর অস্তিত্ত্বের প্রমাণ চেয়েছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে সেটা দেখিয়েছেন।
কুরআন মানুষকে সৃষ্টি ও কুরআনের নিদর্শনগুলি নিয়ে চিন্তাভাবনা ও পর্যবেক্ষণকরার জন্য উৎসাহিত করে।
একমাত্র ইসলাম ধর্মেই তুমি যে কোন প্রশ্ন করলেই লজিক্যাল অ্যানসার পাবে, যেটার একটা পরিপূর্ণ মিনিং রয়েছে। পৃথিবীতে অন্য কোন ধর্মেই এই জিনিসটা নাই, তুমি হাজার প্রশ্ন করেও সঠিক উত্তর পাবে না। গোঁজামিল পাবে।
৪. বৈজ্ঞানিক প্রমাণ
পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত কিছু তথ্য সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। অথচ সাড়ে ১৪০০ বছর আগে মরুভূমির ভিতর লেখাপড়া না জানা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাঃ এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন।
যেমন:
- দুইটি সাগর পাশাপাশি কিন্তু মিলেনা:
“তিনি প্রবাহিত করেন দুই সমুদ্র যারা পরস্পর মিলিত হয়,কিন্তু তাদের উভয়ের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরাল যা তারা অতিক্রম করতে পারে না” (সূরা الرحمن ৫৫:১৯-২০) - ব্যাখ্যা:
আল্লাহ দুটি সমুদ্রকে পাশাপাশি প্রবাহিত হতে দেন,একটি লোনা পানি, আরেকটি তুলনামূলকভাবে কম লবণাক্ত বা অন্য বৈশিষ্ট্যের।
তুমি ভাবতে পারো, দু’টো পানি যেহেতু পাশাপাশি আছে, তারা হয়তো মিশে যাবে।
কিন্তু আল্লাহ এমন একটি অদৃশ্য দেয়াল (barrier) রেখেছেন, যার কারণে দুই ধরনের পানিই নিজেদের সীমানায় থাকে। তারা পুরোপুরি মিশে যায় না। বিজ্ঞানীরা একে “সার্ফেস টেনশন” এবং “হ্যালোক্লাইন” (Halocline) বলে।
যেমন মনে কর, তুমি দুই রঙের জুস একই গ্লাসে ঢালো, কিন্তু যদি তাদের ঘনত্ব (density) আলাদা হয়, তাহলে তারা সহজে মিশবে না।
এটা মহান আল্লাহর কুদরতের এক নিদর্শন।
- ইউনিভার্সের সম্প্রসারণ:
“আর আসমান আমরা তা নির্মাণ করেছি আমাদের ক্ষমতা বলে এবং আমরা নিশ্চয়ই মহাসম্প্রসারণকারী।” (সূরা আজ-জারিয়াত ৫১:৪৭)
- ব্যাখ্যা:
আল্লাহ বলেছেন আকাশমণ্ডলী বা মহাবিশ্ব (universe) তিনি তাঁর মহশক্তি দ্বারা তৈরি করেছেন এবং এটি ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে।
- ব্যাখ্যা:
আজ বিজ্ঞানীরা টেলিস্কোপ দিয়ে দেখতে পেয়েছে যে,
গ্যালাক্সি, তারা, গ্রহ,সবকিছু একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ঠিক যেমন তুমি একটি বেলুনে দাগ দাও, তারপর বেলুন ফোলাতে থাকো,
বেলুন বড় হতে থাকলে দাগগুলোও কিন্তু দূরে সরে যায়। মহাবিশ্বও ঠিক এভাবে বড় হচ্ছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এ কথা বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে মাত্র ১০০ বছর আগে, আর আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা ১৪০০ বছর আগে পবিত্র কুরআনে বলে দিয়েছেন!
- পর্বতের কাজ :
“এবং আমরা পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছি সুদৃঢ় পর্বত, যাতে যমীন তাদেরকে নিয়ে এদিক-ওদিক ঢলে না যায় এবং আমরা সেখানে করে দিয়েছি প্রশস্ত পথ, যাতে তারা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারে।” (সূরা আনবিয়া ২১:৩১)- ব্যাখ্যা:
আল্লাহ পৃথিবীর উপর বড় বড় পর্বত বানিয়েছেন যাতে পৃথিবী স্থির থাকে।
পর্বতগুলো শুধু উপরে যা দেখা যায় তা-ই নয়, নিচেও অনেক গভীর পর্যন্ত শিকড়ের মতো বিস্তৃত থাকে। বরং উপরে যা দেখা যায় তার কয়েকগুন বেশি মাটির গভীরে আছে। সুবহানআল্লাহ
- ব্যাখ্যা:
বিজ্ঞানীরা এখন বলছে,
পর্বত পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠকে “পেরেকের মতো গেঁথে” রাখে। যেমন একটি তাঁবু পেরেক ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, তেমনি পৃথিবীতে পর্বত না থাকলে বেশি নড়াচড়া করতে থাকত। এগুলো ভূমিকম্প কমাতে সাহায্য করে এবং পৃথিবীকে স্থিতিশীল রাখে।
৫. নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের কথা আগের ধর্মীয় গ্রন্থে ছিল
ব্যাখ্যা
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা দুনিয়াতে অসংখ্য নবী ও রাসুল পাঠিয়েছেন মানুষের হিদায়াতের জন্য, যেমন মুসা (আঃ), ঈসা (আঃ), ইবরাহিম (আঃ)। এবং তাঁদের উপর আল্লাহ তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিলের মতো কিতাব নাজিল করেছিলেন।
এই কিতাবগুলোতে এমন অনেক ভবিষ্যদ্বাণী (আগাম খবর) ছিল, যেখানে একজন বিশেষ নবীর কথা বলা ছিল…
যিনি শেষ নবী হবেন, সবার জন্য রহমত হয়ে আসবেন, এবং তাঁর নাম হবে “মুহাম্মদ”। আগের কিতাবগুলোতে আরো বলা ছিল,
- তিনি আরবের দিকে আসবেন,
- তিনি উম্মি হবেন (অর্থাৎ তিনি কারো কাছে লেখা-পড়া শেখেননি),
- তিনি নতুন কিতাব নিয়ে আসবেন,
- তাঁর সঙ্গে থাকবে সত্য, ন্যায় ও আলো।
এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো কাদের গ্রন্থে ছিল?
১.তাওরাত (মুসা আঃ-এর কিতাব)
২.ইঞ্জিল (ঈসা আঃ-এর কিতাব)
যেমন আমরা যদি কাউকে বলি, “আগামীকাল একজন মানুষ আসবে, তার গায়ের রং এমন, তার কথা বলার ধরন এমন…”যখন সেই মানুষটি সত্যি আসে, আমরা বুঝে যাই “হ্যাঁ, এই তো সেই ব্যক্তি!”
ঠিক তেমনই, যখন নবী মুহাম্মদ (সা.) আসলেন, তখন অনেক জ্ঞানী ইহুদি ও খ্রিস্টান পাদ্রী বুঝেছিলেন যে এটাই সেই শেষ নবী, যাঁর কথা তাদের কিতাবে বলা ছিল।
পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেনএই কথা –
“আমরা যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা তাকে সেরূপ জানে যেরূপ তারা নিজেদের সন্তানদেরকে চিনে। আর নিশ্চয় তাদের একদল জেনে-বুঝে সত্য গোপন করে থাকে।” সূরা বাকারা ২:১৪৬
ইহুদিরা এবং খ্রিস্টানরা প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাঃ কে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। কারণ তারা ছিল অহংকারী এবং হিংসুটে। তারা ভেবেছিল শেষ নবী তাদের বংশধারা থেকে আসবে।
কেন তাঁরা নবী সাঃ কে মেনে নেয় না?
সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো বংশগত প্রত্যাশা।
১. তারা ভাবত শেষ নবী তাদের বংশধরদের থেকেই আসবে। ইহুদিরামনে করত: শেষ নবী অবশ্যই ইসরাইলি বংশ থেকে আসবেন। তিনি তাদের জাতির নেতা হবেন।
কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত ছিল ভিন্ন। শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) ইসমাইল (আ.)–এর বংশধর, অর্থাৎ আরব থেকে আসেন। আলহামদুলিল্লাহ। এ কারণে তাদের ঈর্ষা, অহংকার ও জাতিগত গর্বের কারণে শেষ নবী মুহাম্মদ সাঃ কে মেনে নেয়নি। এতে তারা হয়েছে পথভ্রষ্ট ও জাহান্নামী।
তারা নিজেদের কিতাব পরিবর্তন করে সত্য কে গোপন করে।
তারা সেই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর অনেক অংশ মুছে দেয়। অনেক অংশ লুকিয়ে ফেলে। নতুন করে নিজেদের হাতে লিখে পরিবর্তন করে। কিছু অংশের ব্যাখ্যা নিজেদের মতো করে বিকৃত করে। পবিত্র কুরআনে এই সত্যটি পরিষ্কারভাবে বলা আছে –
“কাজেই দুর্ভোগ, তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে অতঃপর সামান্য মূল্য পাওয়ার জন্য বলে, ‘এটা আল্লাহ্র কাছ থেকে’। ”- সূরা বাকারা: ৭৯
এভাবে তারা সত্যকে লুকাতে চেয়েছিল, কারণ তারা মেনে নিতে পারেনি যে শেষ নবী তাদের বংশ থেকে আসেননি।