
সন্তান আল্লাহ তাআলার একটি মহান নিয়ামত এবং আমানত। ইসলাম সন্তানকে শুধু পারিবারিক আনন্দের উৎস হিসেবে দেখে না, বরং তাদেরকে আখিরাতের জন্য একটি বড় দায়িত্ব হিসেবেও শিক্ষা দেয়। একজন সন্তান যদি ঈমানদার, সৎ ও দ্বীনদার হয়ে বেড়ে ওঠে, তাহলে সে দুনিয়া ও আখিরাতে মা-বাবার জন্য কল্যাণের কারণ হয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন- “সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য।” সূরা আল-কাহফ ১৮:৪৬
নেক সন্তান সদকায়ে জারিয়া
ইসলামে নেক সন্তানকে সদকায়ে জারিয়া বলা হয়েছে। অর্থাৎ এমন আমল যার সওয়াব মৃত্যুর পরও চলতে থাকে।
মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন- “মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল চলতে থাকে
সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” Sahih Muslim হাদিস নম্বর ১৬৩১
অর্থাৎ সন্তান যদি নেক হয়, সালাত পড়ে, কুরআন শেখে, দোয়া করে এবং ভালো কাজ করে, তাহলে মা-বাবাও সেই সওয়াবের অংশ পেতে থাকে।
সন্তান লালন-পালন একটি আমানত
ইসলামে সন্তানকে শুধু বড় করাই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের ঈমান, চরিত্র ও আখলাক গড়ে তোলাও মা-বাবার দায়িত্ব।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- “হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।” সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬
এই আয়াত আমাদের শেখায় যে সন্তানদের ইসলামের শিক্ষা দেওয়া মা-বাবার ফরজ দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই ইসলাম শেখানো
শিশুর হৃদয় খুব কোমল থাকে। ছোটবেলা থেকেই তাদের মধ্যে ইসলামের ভালোবাসা গড়ে তুলতে হবে।
কী কী শেখাবে
- আল্লাহকে ভালোবাসতে শেখানো
- “বিসমিল্লাহ” বলে কাজ শুরু করা
- সালাম দেওয়া
- সালাতের অভ্যাস করা
- কুরআন তিলাওয়াত শেখানো
- সত্য কথা বলা
- মিথ্যা ও খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা
- দোয়া শেখানো
মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন- “তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে সালাতের নির্দেশ দাও।” Sunan Abu Dawud হাদিস নম্বর ৪৯৫
সন্তানদের সম্মান করা ও ভালোবাসা
ইসলাম সন্তানদের সম্মান করতে শিক্ষা দেয়। নবী ﷺ শিশুদের প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও কোমল আচরণ করতেন।
একবার নবী ﷺ তাঁর নাতিদের চুমু দিচ্ছিলেন। তখন একজন সাহাবি বললেন, “আমার দশ সন্তান আছে, কিন্তু আমি কখনো কাউকে চুমু দেইনি।” তখন নবী ﷺ বললেন-
“যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।” Sahih al-Bukhari হাদিস নম্বর ৫৯৯৭
এ থেকে বোঝা যায় সন্তানদের সাথে কঠোরতা নয়, বরং দয়া, সম্মান ও ভালোবাসার আচরণ করা উচিত।
সন্তানদের সামনে মা-বাবার দায়িত্ব
সন্তানরা সবচেয়ে বেশি শেখে মা-বাবাকে দেখে। তাই মা-বাবাকে আগে নিজের আমল ঠিক করতে হবে।
- সন্তানদের সামনে সালাত পড়া
- কুরআন তিলাওয়াত করা
- মিথ্যা না বলা
- ভালো আচরণ করা
- হারাম থেকে বেঁচে থাকা
কারণ সন্তানরা কথার চেয়ে কাজ থেকে বেশি শিক্ষা নেয়।
সন্তানদের জন্য কুরআনের দোয়া
১. নেক সন্তান চাওয়ার দোয়া
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ
উচ্চারণ- রব্বি হাবলি মিনাস সালিহীন
অর্থ- হে আমার রব, আমাকে নেক সন্তান দান করুন- সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০০
২. সন্তানদের সালাতি বানানোর দোয়া
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
উচ্চারণ- রব্বিজ আলনি মুকীমাস সালাতি ওয়া মিন যুররিয়্যাতি রাব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দু‘আই
অর্থ- ‘হে আমার রব, আমাকে এবং আমার সন্তানদের সালাত প্রতিষ্ঠাকারী বানান। হে আমাদের রব, আমার দোয়া কবুল করুন’ সূরা ইবরাহীম ১৪:৪০
৩. পবিত্র কুরআনে একটি অত্যন্ত সুন্দর দোয়া, যা পরিবার, সন্তান এবং নেক জীবনসঙ্গীর জন্য করা হয়।
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণ- রাব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইউনিওঁ ওয়াজ‘আলনা লিল মুত্তাকীনা ইমামা
অর্থ-হে আমাদের রব, আমাদের স্ত্রীদের এবং সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানান। সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭৪
এই দোয়ায় একজন মুমিন আল্লাহর কাছে নেক পরিবার, নেক সন্তান এবং তাকওয়াবান জীবনের জন্য প্রার্থনা করে।
সন্তানদের জন্য হাদিসের দোয়া
মুহাম্মদ (সা.) হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য দোয়া করতেন-
أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
উচ্চারণ- উ‘ঈযুকুমা বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাহ মিন কুল্লি শাইতানিওঁ ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিল লাম্মাহ
“আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর পূর্ণ বাণীর মাধ্যমে আশ্রয় চাই, প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং কুদৃষ্টি থেকে।” Sahih al-Bukhari হাদিস নম্বর ৩৩৭১
ইসলামে কন্যা সন্তানের মর্যাদা
ইসলাম কন্যা সন্তানকে অপমান বা বোঝা মনে করে না। বরং ইসলাম কন্যাদেরকে সম্মান, ভালোবাসা, নিরাপত্তা এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছে। এমন এক সমাজে ইসলাম এসেছিল যেখানে মানুষ কন্যা সন্তান জন্ম নিলে লজ্জা পেত এবং অনেকেই জীবন্ত কবর দিত। ইসলাম সেই অন্ধকার প্রথা বন্ধ করে কন্যাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে।
কুরআনে কন্যা সন্তান সম্পর্কে
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন- “আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।” সূরা আশ-শূরা ৪২:৪৯
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, কন্যা সন্তান আল্লাহর বিশেষ দান ও নিয়ামত।
ইসলাম জাহেলি যুগের নিষ্ঠুরতা বন্ধ করেছে
ইসলামের আগে আরব সমাজে কন্যা সন্তান জন্মকে অপমান মনে করা হতো। ইসলাম এসে এই অন্যায়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- “যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” সূরা আত-তাকভীর ৮১:৮-৯
এই আয়াত কন্যা সন্তানের প্রতি ইসলামের দয়া ও সম্মানের বড় প্রমাণ।
কন্যা সন্তান লালন-পালনের ফজিলত
মুহাম্মদ (সা.) কন্যা সন্তানদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তিনি তাদের সম্মান করতেন, ভালোবাসতেন এবং তাদের সুন্দরভাবে লালন-পালন করতে উৎসাহ দিতেন।
তিনি বলেছেন – “যে ব্যক্তি দুই কন্যা সন্তানকে যত্নসহকারে লালন-পালন করবে যতক্ষণ না তারা বড় হয়, কিয়ামতের দিন সে আমার সাথে এভাবে থাকবে।”
তারপর নবী ﷺ তাঁর দুই আঙুল একত্র করলেন। Sahih Muslim হাদিস নম্বর ২৬৩১
কন্যা সন্তান জান্নাতের কারণ হতে পারে
মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন- “যার তিনটি কন্যা সন্তান আছে, আর সে তাদের ধৈর্যের সাথে লালন-পালন করে, তাদেরকে খাবার দেয়, পোশাক দেয় এবং দয়া করে, তাহলে সেই কন্যারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে পর্দা হয়ে যাবে।” Sunan Ibn Majah হাদিস নম্বর ৩৬৬৯
অন্য বর্ণনায় দুই কন্যা সন্তানের ব্যাপারেও একই সুসংবাদ এসেছে।
নবী ﷺ নিজের কন্যাদের সম্মান করতেন
রাসূল ﷺ তাঁর কন্যা Fatimah (রা.)-কে অত্যন্ত সম্মান করতেন। যখন ফাতিমা (রা.) আসতেন, তখন নবী ﷺ দাঁড়িয়ে যেতেন, তাকে স্বাগত জানাতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন। Sunan Abu Dawud হাদিস নম্বর ৫২১৭
এটি আমাদের শেখায়, কন্যাদের সম্মান করা সুন্নাহ।
কন্যা সন্তান আল্লাহর আমানত
কন্যা সন্তানকে দুর্বল বা বোঝা মনে করা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং তাদেরকে ভালোবাসা, দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া, নিরাপত্তা দেওয়া এবং সম্মানের সাথে বড় করা মা-বাবার দায়িত্ব।
- তাদেরকে সালাত শেখাও
- কুরআন শেখাও
- আত্মসম্মান শেখাও
- দয়া ও ভালোবাসা দাও
- ইসলামী চরিত্র গড়ে তুলতে সাহায্য করো
সংক্ষেপে
ইসলাম কন্যা সন্তানকে
- আল্লাহর নিয়ামত বলেছে
- জান্নাতের কারণ বলেছে
- সম্মান ও দয়ার শিক্ষা দিয়েছে
- তাদের সুন্দরভাবে লালন-পালনকে বড় নেক আমল বানিয়েছে
তাই কন্যা সন্তানকে ভালোবাসা, সম্মান করা এবং ইসলামের পথে গড়ে তোলা একজন মুসলিম মা-বাবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ইসলামে সন্তান শুধু দুনিয়ার সুখ নয়, বরং আখিরাতের বিনিয়োগ। তাই সন্তানদের
- ঈমান শেখাও
- সালাত শেখাও
- কুরআন শেখাও
- ভালোবাসা ও সম্মানের সাথে বড় করো
- তাদের জন্য নিয়মিত দোয়া করো
নেক সন্তান মা-বাবার জন্য দুনিয়াতেও শান্তি এবং আখিরাতেও অবিরাম সওয়াবের কারণ।