মা-বাবার মর্যাদার চুড়ান্ত  শিখর

এই প্ল্যাটফর্মে ইসলাম শেখা হয় সবচেয়ে সহজ, পরিষ্কার ও হৃদয়ছোঁয়াভাবে।নামাজ, ওযু, আদব-কায়দা আর আল্লাহকে চেনার সুন্দরতম পথ।

IMG_0528

একটা সত্য ঘটনা বলা যাক।

সমাজ-সংসারে প্রতিষ্ঠিত  একজন ডাক্তার এই প্রথম জানতে পারলো, সে যে মা-বাবার সাথে থাকে তাঁরা তার আসল মা-বাবা নন।

এই মা-বাবা তাকে জন্মের একদিন পর তার বায়োলজিকাল  মায়ের নিকট থেকে নিয়ে এসে লালন পালন করে ডাক্তার বানিয়েছেন। ওয়াদা অনুযায়ী এরপর  আর কোনো দিনও তারা ঐ আপন মায়ের সাথে দেখা করেন নি। ডাক্তারের আসল বাবাকে এরা চেনেন না। পালক মা-বাবা শুধুমাত্র আসল মায়ের  নাম আর গ্রামের নাম জানেন। 

এটুকু জানার পর ডাক্তার আপন মাকে খুঁজে বের করার জন্য একেবারে অস্থির হয়ে উঠলো। কিন্তু যখন  জানলো- সে মায়ের অবাঞ্ছিত সন্তান, তখন ডাক্তার  শোকে পাথর হয়ে গেল। তার বারবার মনে হতে লাগলো- যে মা তাকে জন্মের সাথে সাথে পরিত্যাগ করেছে, এমন নিষ্ঠুর মাকে সে কেন খুঁজবে!

 এ অবস্থায় একজন বিজ্ঞ আলেম তাকে জানালেন, এতে করে তার কাছে  তার আপন মায়ের মর্যাদা এক ফোঁটাও কমে যায়নি। অন্যান্য স্বাভাবিক  সন্তানের মতোই  তাকে তার মায়ের প্রতি সকল দায়িত্ব কর্তব্য পালন করার নির্দেশনা কোরআন-হাদীসে রয়েছে; এক রত্তিও কম করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। 

একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো আল্লাহর  ইবাদত করা, এরপরের কাজটিই হলো মা-বাবার মর্যাদা রক্ষা করা।

কোরআনে আল্লাহর আদেশ লক্ষ্য করলে তা স্পষ্ট বুঝা যায়:

১। সূরা আন-নিসা (৪:৩৬): “আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। আর পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর…।” 

২। সূরা আল-ইসরা (১৭:২৩ ও২৪):

“তোমার প্রতিপালক হুকুম জারি করেছেন যে, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করো না, আর পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন বা তাদের উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের প্রতি ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না, বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বল।”

“আর তাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে নিজেকে বিনয়াবনত কর এবং বল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।”

৩। সূরা লুকমান (৩১:১৪): “আর আমরা মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি; তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং দুই বছর পর্যন্ত তার দুধ ছাড়ানো হয়েছে। সুতরাং আমার (আল্লাহর) প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে।” 

এক ব্যক্তি নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে বেশি সদ্ব্যবহার পাওয়ার যোগ্য কে? ‘উত্তরে তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ 

-‘এরপর কে?’

-‘তোমার মা।’ 

-‘তারপর কে?’

-‘তোমার মা।’ 

 চতুর্থবার বললেন, ‘তোমার বাবা।’ 

এ ঘটনার ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার জাকির নায়েক বলে থাকেন- মা পেলেন গোল্ড মেডেল, সিলভার মেডেল, ব্রোঞ্জ মেডেল আর বাবা শুধু সান্তনা পুরষ্কার। 

রাসুল (সাঃ) একদিন তাঁর সাহাবীদের সাথে আলাপ করছিলেন। এমন সময় এক বৃদ্ধা সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। নবীজি বৃদ্ধাকে দেখে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন,  নিজের গায়ের চাদরটি মাটিতে বিছিয়ে তাঁকে বসতে দিলেন। তারপর অত্যন্ত মর্যাদার সাথে বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বললেন। বৃদ্ধা চলে গেলে সাহাবীগণ বিষ্মিত হয়ে নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এই মহিলা, যার জন্য আপনার এতো শ্রদ্ধা-সম্মান-মমতা?’ নবীজি উত্তরে বললেন, ‘তিনি আমার দুধমা হালিমা।’ তিনি আরো জানালেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরেই মায়ের স্থান এবং মায়ের পায়ের নিচেই সন্তানের বেহেশত।’ তিনি এ-ও বলেছেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা ও পিতা-মাতার সঙ্গে অসদাচরণ করা অনেক বড় কবিরা গুনাহ।’

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট জিহাদে অংশগ্রহণের ব্যাপারে অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি তাকে জিজ্ঞাসা  করলেন, ‘তোমার পিতামাতা জীবিত আছে কি?’ সে উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বললে তিনি বললেন, ‘তুমি তাঁদের নিকট অবস্থান কর এবং সাধ্যমত তাঁদের সেবা কর।’

সহীহ মুসলিমের একটি হাদিস: “রাসূলুল্লাহ  বলেছেন, ‘সে ব্যক্তির নাক ধুলিমলিন হোক, সে ব্যক্তির নাক ধুলিমলিন হোক, সে ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক!’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! কার?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতামাতা উভয়কে কিংবা একজনকে বার্ধক্যাবস্থায় পেল এবং সে জান্নাতে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করল না।’

একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ থাকা কর্তব্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি, এরপর তার মা-বাবার কাছে। 

শেয়ার করুন

Related Topic